• সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৮ পূর্বাহ্ন
  • ই-পেপার

অবৈধভাবে ইতালীযাত্রা : মাদারীপুরের ১০ যুবক নিখোজ ॥ সন্ধান চায় নিখোজদের পরিবার

Reporter Name / ৩৩ Time View
Update : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬

সুবর্ণগ্রাম সংবাদ. মাদারীপুর।

স্বপ্নে দেশ ইতালীতে অবৈধভাবে যাবার পথে মাদারীপুরের ১০ যুবক নিখোজ আছেন। তারা কেমন আছেন, বেঁচে আছেন কিনা তাদের পরিবার জানেন না। গত প্রায় দশ মাস ধরে পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। পরিবারগুলো দালালের পিছনে ঘুরলেও কোন লাভ হয়নি। নিখোজদের কোন সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

নিখোঁজ যুবকরা হলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের মাছকান্দি গ্রামের মোহাম্মদ আলী (২২), একই উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া এলাকবার জুলহাস চোকদারের ছেলে ওয়ালিদ হাসান অভি (১৯), একই উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকার আনোয়ার বেপারীর ছেলে লিমন বেপারী (১৯), একই উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকার হেমায়েত মাতুব্বরের ছেলে রবিউল মাতুব্বর (২২), একই উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের দত্তেরহাট এলাকার টিটু মাতুব্বরের ছেলে মো. জয় মাতুব্বর (২০), একই উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকার মোক্তার হাওলাদারের ছেলে জিদান হোসেন হাওলাদার (১৮), একই উপজেলার নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকার মো. মাহাবুব (২১), রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের মাচ্চর এলাকার আবুল বাশার মাতুব্বরের ছেলে শরিফুল ইসলাম (২৭), একই উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের পাখুল্লা এলাকার হাশেম খাঁর ছেলে আজমুল খাঁ (৩০), একই উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি এলাকার কালু মজুমদারের ছেলে তুহিন মজুমদার (২৩)।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের গাজীরচর এলাকার জাহাঙ্গীর ঢালীর স্ত্রী দালাল পেয়ারা বেগমের খপ্পড়ে পড়েন এই যুবকরা। যুবকদের পরিবারের সাথে ১৫ লাখ টাকা করে চুক্তি করেন। সবাইকে সরাসরি ইতালি নিয়ে যাওয়া হবে বলে আশ^স্ত করেন দালাল পেয়ারা বেগম। চুক্তি অনুযারী প্রত্যেকে ১৫ লাখ টাকা করে দেয়ার পর গত বছরের জানুয়ারিতে বাড়ি ছাড়েন লিমন বেপারী, জয় আহম্মেদ, রবিউল মাতুব্বর, ওয়ালিদ হাসান, জিদান হোসেন, শরিফুল ইসলাম, আজমুল খাঁ, মোহাম্মদ আলী, তুহিন মজুমদার, মাহবুবসহ ১০ যুবক। পরে তাদের সবাইকে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যান। পরে সেখানে তাদের সাবইকে আটকে রাখা হয়। মুক্তিপনের জন্য শুরু হয় শারিরিক ও মানসিক নির্যাতন। এরপর নির্যাতনের ভিডিও, ছবি ও ভয়েজ পাঠিয়ে প্রত্যকের পরিবার থেকে মুক্তিপনের লাখ লাখ টাকা আদায় করে দালালচক্র। সবশেষে গত বছরের এপ্রিলে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লিবিয়া হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে যুবকরা। এরপর থেকে আর কোন সন্ধান পায়নি তাদের পরিবার। তারা বেচে আছেন, নাকি মরে গেছেন কিছুই জানেনা তারা। দালালদের পিছনে ঘুরতে ঘুরতে পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এই নিখোজের ব্যাপারটি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিলে সম্প্রতি অভিযুক্ত দালাল পেয়ারা বেগম বাড়িঘরে তালা দিয়ে পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে সে বেশ টাকার মালিক হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি টিনশেট ঘরের বিপরিতে একটি সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। তাই স্থানীয়দের অভিযোগ মানবপাচারের টাকা দিয়েই তিনি এই ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছে। পেয়ারা বেগমের বড় ছেলে ফারদিন ঢালী ইতালি অবস্থান করেন। তার সহযোগিতায় পেয়ারা বেগম এই মানবপাচারের কাজ করেন। তাছাড়া তার ছোট ছেলে সৌরভ যুবকদের পরিবারের কাছে থেকে টাকা আদায় করেন। এর সঙ্গে জড়িত আছেন শরিয়তপুর জেলার জালাল কাজীর ছেলে সবুজ কাজী ও লিয়াকত শেখে ছেলে মুজাহিদ শেখ। সবুজ ও মুজাহিদ সম্পর্কে শ্যালক ও দুলাভাই। তারা সবাই মিলে একটি দালাল চক্র তৈরি করে যুবকদের প্রলোভন দেখিয়ে ফাদে ফেলে। নাম না প্রকাশে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, পেয়ারা বেগম হঠাৎ করে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। যেন আঙ্গুল ফুলে কলা গাছের মতো অবস্থা। তাই তার ব্যাপারে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অভিযুক্ত দালাল পেয়ারা বেগমসহ তার পরিবার গা ঢাকা দেয়ার তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকার নিখোঁজ লিমনের বাবা আনোয়ার বেপারী বলেন, দালাল পেয়ারা বেগমের প্রলোভনে পড়ে আমার ছেলে ইতালী যাবার জন্য পাগল হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে তার কাছে পাসপোর্ট ও টাকা জমা দেই। ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি করা হয়। পরবর্তীতে লিবিয়া আটকে রেখে আরো টাকা দেয়া হয়েছে। সর্বমোট আমরা ২৮ লাখ টাকা দিয়েছি। তবুও আমার ছেলের কোন খোজ নেই। ছেলে কেমন আছে, বেচে আছে কিনা তাও জানিনা।

মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের দত্তেরহাট এলাকার নিখোজ জয় মাতুব্বরের বাবা টিটু মাতুব্বর বলেন, পেয়ারা বেগমের বাড়িতে আমার ছেলের যাতায়াত ছিলো। অনেক সময় তাদের বাড়ির অনেক কাজ করে দিতেন। সেখান থেকেই লোভ দেখায়। পরে লিবিয়া নিয়ে একবার মাফিয়াদের কাছে ধরা পড়েছিলো। পরে ১২ লাখ টাকা দিলে মুক্তি হয়। এরপর গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে আর কোন খবর পাচ্ছি না। মোবাইলেও কোন যোগাযোগ হয় না। একমাত্র পেয়ারা বেগমই জানেন আমার ছেলে কোথায় আছে। পেয়ারা বেগমের পিছনে ঘুরে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পেয়ারা বেগম ঠিকমতো কথা বলতে চায় না। শুধু আমাদের ঘুরাই। তারপর সম্প্রতি সে গা ঢাকা দিয়েছে। আমরা পেয়ারা বেগমের শাস্তি দাবী করছি।

রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের মাচ্চর এলাকার নিখোজ শরিফুল ইসলামের মা রাজিয়া বেগম বলেন, পেয়ারা বেগম ও তার লোকজনের খপ্পরে পরে আমার ছেলে এখন নিখোজ আছে। পেয়ারা বেগম বলেছিলো আমার ছেলেকে সরাসরি ইতালী নিয়ে যাবে। কিন্তু তা করেনি। লিবিয়া নিয়ে বন্দি করে রেখেছিলো। গত বছরের ১২ এপ্রিলের পর আমার ছেলের সাথে আর যোগাযোগ করতে দেয়নি। আমার ছেলে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে তাও জানি না। আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই। আর পেয়ারাসহ এই দালালচক্রের সবার বিচার চাই।

এ ব্যাপারে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিখোঁজ ১০ যুবকের পরিবারের মধ্যে একজনের পরিবার একটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় তিনজন গ্রেফতার আছে। এছাড়া বাকি নিখোঁজদের পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা সব সময়ই মানবপাচারের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে থাকি।

-এসকে অভিজিৎ. মাদারীপুর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category